আচ্ছে-দিন, স্বপ্নের বাজেট ও একটি রাজকীয় সফর বৃত্তান্ত

 

সমরেন্দ্র বিশ্বাস


বিজ্ঞাপণ

আমার কাছে বিজ্ঞাপণটা এসেছিল। ভালো দিন , মানে আচ্ছে-দিন আসছে। জনগনের দিনযাপনকে মাথায় রেখে কোন কোন নাগরিক স্বপ্নের বাজেট বানাতে পারে ?  জনগনের পরামর্শ জরুরী! এরকম বিজ্ঞাপণ দেখার পর আমার দিন গেল, ঘুম গেল। একটা উড়ো উড়ো ভাব !

ঘরের সামনে মাটির রাস্তাটা পাকা করার জন্যে কত টাকা, হাসপাতালে ডাক্তারদের ধরে রাখবার জন্যে কত টাকা, উন্নত প্রযুক্তিতে কেক বানানোর জন্যে কত টাকা, আমাদের ঘরে বিধবা যে বুড়ি আম্মা কাজ করে- তার সদগতির জন্যে কত টাকা, আমি যদি শপিং মল-এ সিনেমা দেখতে যাই, তাতে ভর্তুকির জন্যে কত টাকা । বাজেট বানানোর এমনি কিছু চিন্তা আমার মাথায় ঘুর পাক খাচ্ছে। টাকা আয়ের জন্যে ওই রাস্তার উপর গেট বানাবো। কেউ আসতে যেতে ট্যাক্স নেয়া হবে। দিশি লিকারের উপর ট্যাক্স – বিদেশী মদের বিক্রি বাড়বেই ; তাতেও আয় । একসময়ে আমার আয় ব্যয়ের এই ভাবনাগুলো বাড়িতে পড়ে থাকা পুরাণো একটা ফর্দ লেখার খাতায় টুকে রাখলাম। ভাবলাম, এগুলোকে ফেয়ার করে সুদৃশ্য কাগজে লিখবো, একটা স্বপ্নের বাজেট বানাবো। 


স্বপ্ন সারারাত

গতকাল স্বপ্নের মধ্যে সারারাত আমি দেশের বাজেট বানিয়েছি। কত টাকা আয় হবে, কত ব্যয় । আয় হবে কোন রাস্তায়, ব্যয় হবে কেমন করে। সারারাত আমার বাজেটের মধ্যে স্বপ্নরা ঝরে পড়েছে ! চাকুরি পাওয়ার লোভে কম্পিউটর শিখেছিলাম। এক্সেল শীটে আমার টাকা-পয়সাগুলো বন্ধুর মতো, সুনিপুণ, অথচ চতুর !

আমার বিছানার পাশে একটা ভূবণ মনমোহিনী আচ্ছে-দিনের বাজেট তারাপদর বিলের ওপার থেকে ডানা মেলে উড়ে এলো টিভিতে ভবিষ্যত বানী - আগামী দিনগুলো সুখ ও শান্তির, সম্বৃদ্ধির। দুবেলা খাবার নিশ্চিত, সবার জন্যে রোজগার ,স্বাস্থ্য ও চিকিচ্ছা সামনেই জনগনের দিন, দুচোখ ভরা স্বপ্নের বারোমাস্যা !

আমি স্পষ্ট দেখি, মুদ্রাগুলো উড়ে আসছে। স্বপ্নের মুদ্রাগুলোর শরীরে পাখনা লাগানো, সহজেই কোষাগার থেকে উড়ে এসে আমার টেবিলে বসে। টাকাগুলোর মুখে প্রাইম মিনিষ্টারের বরাভয় মার্কা প্রত্যয় আমাদের বক্স-টিভির মধ্য দিয়ে একটা হাত বেরিয়ে এলো – লিফলেট বিলি করছে  ভাঙা সিনেমার স্ক্রীনে সুন্দর দিনের সরকারী বিজ্ঞাপণ !

আমার ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে টাকা থাকে না। ঘুমের মধ্যে দেখি , আমার বানানো  বাজেটের কাগজগুলোর ভাঁজ থেকে মুদ্রাগুলো বেরিয়ে আসছে; খিল খিল হাসছে । এই মুদ্রাগুলো আমাকে নিয়ে যাচ্ছে শপিং মলে, হোটেলে।

স্বপ্নের মধ্যেই মুদ্রাগুলো আমাকে পৌঁছে দিল মধ্যযুগীয় বধ্যভূমির কাছাকাছি, একটা বিমান উড়ান কেন্দ্রে। সেখানে দেখি, সিলভার পেইন্ট করা ধূর্ত ঈগল, মানে এরোপ্লেনগুলো, দাঁড়িয়ে আছেআমার তৈরী করা বাজেটের স্বপ্ন-কাগজ আমার পকেটেই ভাঁজ করে রাখা ।

- ‘কি গো , রাজধানী যাবে নাকি ?’

আমি একটা বিমানে উঠে পড়ি ।


উড়ান

অনিবার্য স্বপ্ন । আধা ঘুমের মধ্যেই আমি  বিছানা ছেড়ে উঠে এসেছিলাম। পেটে খিদে ! ঈগলের ভেতরে ঢুকে বুভুক্ষু পেটে কষে সীট-বেল্ট বাঁধি। স্বপ্নে বানানো বাজেটের কাগজটা পকেটেই সিলভার পেইন্ট করা ধূর্ত ঈগলটা ওড়াতে ওড়াতে আমাকে নিয়ে যায় রাজধানী দিল্লীতে, পৌঁছে দেয় সরকারী আস্তানায়

স্বপ্নের মুদ্রাগুলো আবার খলখল করে হেসে ওঠে। আমি চেঁচিয়ে বলি- ‘আমার খিদে পেয়েছে’ ।

মুদ্রাগুলো আমায় শাসায়। বলে অপেক্ষা করো। চেঁচিও না। সামনে সবার জন্যে ভরাপেট স্বপ্নের দিন আসছে

আমি একটা স্বপ্নের বাজেট বানাতে সক্ষম হয়েছি, রাজ কর্মচারীরা আমার সঙ্গে হাত মেলায়   বিল্ডিং চত্বরে মাইনে পাওয়া সুরক্ষা কর্মীরা আমাকে স্যালুট করেএমন কি ক্ষমতাসীন পেটমোটা কোন নেতা ফুলের তোড়া দিয়ে আমাকে স্বাগত জানায়। প্রচন্ড ক্ষিধেয় কয়েকটা ফুলের পাপড়ি আর  পাতার গন্ধ শুঁকি, মুখে তুলে দেই, চিবোতে থাকি। কেউ বলে ওঠে ‘ আদমিকো ভুখ লাগা , ইস্‌কে লিয়ে খানা কা বন্ধবস্তো হোনা হ্যায় ’ মুহুর্তেই চলে আসে রাজকীয় বিশেষ বাহন । আমাকে নিয়ে যাওয়া হয় প্রায় অন্ধকার কো্নো একটা হলঘরে


ডাইনিং হল

ডাইনিং হলে পৌঁছে টেবিলে বসতেই দপ্‌ করে জ্বলে ওঠে অতি উজ্জ্বল আলো। ধীরে ধীরে আলো ম্লান হয়ে যায়। ধীরে ধীরে সেই আলো আবার জ্বলে ওঠে- রাজকীয় স্পর্ধার মতো উজ্জ্বল !  হলে আগে থেকেই বসে আছে আরো কয়েকজন মানুষ ওরাও সারা রাত আমার মতো বাজেটের স্বপ্ন দেখেছে একটা স্বপ্নের বাজেটের খসড়া বানাতে সক্ষম হয়েছে

হলের মধ্যে অনেকগুলো চেম্বার । ডাইনিং হলের একটা সুসজ্জিত চেম্বারে আমাকে বসিয়ে দেয়া হলো একটা চেয়ার, দাঁততোলার দোকানের মেশিন যেমন হয়।একটা  টেবিলও টেবিলে সাজানো সারি সারি খাবার ! আমার কোমরে বেল্ট, দুটো হাতই চেয়ারের হাতলে স্ট্রাপ দিয়ে বাঁধা।

মেশিনের থেকে নেমে এলো হাত, একটা সুগন্ধি রুমাল। খাবার আগে মেশিনের হাত মুছে দিল আমার চোখ আর মুখ। তারপর একটা রাবারের নল সিধা ঢুকে গেল আমার পেটে। এম-এন-সি বা বহুজাতিক কম্পানীর ফিডিং মেশিন, ইম্পোর্টেড খাবার জোগান দেয়া আর খাইয়ে দেবার যন্ত্র। অত্যন্ত সমীহ সহকারে আমার পাকস্থলীতে ঢুকে যেতে লাগলো আমেরিকান চিকেন স্টু, আফ্রিকার খেজুরের জুস, মধ্য এশিয়ার চালের সরবত। ক্ষুধার্ত আমি। খেতে খেতে অনুভব করতে লাগলাম আচ্ছা-দিনের আলো। ফিডিং মেশিন আমাকে খাদ্য দিল, পানীয় দিল। মেশিনের চার্লি চ্যাপলিন কোট ঢাকা হাত আমার মুখ মুছিয়ে দিচ্ছিল। খাওয়া শেষ, সুগন্ধিত রুমাল। হঠাৎ মেশিন গেল বিগড়ে ! চ্যাপলিনের সিনেমায় দেখা মেশিনের হাত আমার গালে থাপ্পর লাগালো কি মুস্কিল ! থাপ্পর চলছে তো চলছেই। ইঞ্জিনীয়ার ছুটে এসে তাড়াতাড়ি ফিডিং মেশিনের সুইচ অফ করে দিল। সবিনয়ে সে আমার কাছে ক্ষমা চেয়ে নিলো,  আরো অনেক যান্ত্রিক থাপ্পরের হাত থেকে বাঁচলাম। ফিডিং মেশিনের চেয়ারের সঙ্গে বাঁধা বেল্ট খুলে গেল। ভরা পেটে নেমে এলাম।


 রোবট কর্মচারী

পাশেই ছিল একটা চলমান রাস্তা- আমি দাঁড়াতেই হাতল লাগানো সেই রাস্তাটা চলতে শুরু করলো । কিছুটা এগুতেই আরো একটা এস্কালেটর আমাকে কোলে তুলে নিল।  ভয়ে ভয়ে আমি এগোচ্ছি, এগোচ্ছি- ডিসচার্জ পয়েন্ট। এস্কালেটরের শেষ প্রান্তে আমাকে নামিয়ে দেয়া হলো। একজন কর্মচারী , গায়ে ইস্পাতের বর্ম; তার মাথায় রোবটের মতো লাল আলো জ্বলছিল। হাসলো- ‘কি কেমন? খাওয়া দাওয়া হলো ? ভালো লাগলো ?’

বলতে হয়, তাই বললাম-‘হ্যাঁ, ভালোই...কিন্তু আপনাদের এখানে মেশিনে খাওয়ানো ছাড়া ... নিজের হাত দিয়ে খাবার মতো ডাল , ভাত, আলুভাজা পাওয়া যায় না ?’ মেশিনের হাতে খাবার-খাওয়া , পেটে ঢোকানো নলের অভিজ্ঞতায় আমার বুক থরহরি ! রোবট কর্মচারী বললো- ‘আরে, ওসব তো ব্যাক ডেটেড ব্যাপারএসব হচ্ছে আচ্ছে-দিনের আয়োজন !’

- ‘ দেখুন তো, কাল রাতে আপনি ঘুমের মধ্যে যে স্বপ্নের বাজেট বানিয়েছিলেন, তাকে সম্মান দেয়ার জন্যে আপনাকে আমরা সসম্মানে আমন্ত্রণ জানিয়েছি। আপনি ঠিক বুঝে গেছেন কি করে পয়সা আদায় করতে হয়, কি করে বাজেট বানাতে হয়। আপনাকে আমরা সম্মান জানাই । আপনার সেই আইডিয়াটা কিন্তু চমৎকার – আপনার বাড়ির সামনের রাস্তায় হাটতে গেলে কিংবা মাঠটায় সকালের হাওয়া খেতে গেলে যে কোন লোককেই ট্যাক্স দিতে হবে!’

আমি বললাম- ‘ আমার স্বপ্নে দেখা বাজেট , আর আপনাদের আসল বাজেট - সে কি একই কথা? আপনাদের সঙ্গে কত বড় দপ্তর আছে, ইকোনোমিষ্ট আছে । কাউর কাছে শুনেছিলাম, উৎসাহ দেয়ার জন্যে বাজেট বানানোর একটা সরকারী প্রতিযোগিতা চলছে ! তাছাড়া বাজেট বানানো প্রত্যেককেই জানতে হয়। তারপর স্বপ্নের ঘোরে  কি একটা বাজেট বানিয়েছিলাম, ফর্দ লেখার খাতায় এসব  আইডিয়া টুকেও রেখেছি।  আসলে বাজেট-টাজেটের আমি আর এত সব কি বুঝি ! ’

- ‘ আমি অল্প স্বল্প লেখাপড়া জানা ছোট খাট একটা মানুষ ! আমার ঘরে বউ আছে, দুটো ছেলে আর একটা মেয়ে, এনিয়েই আমার সংসার ...।’ আধা ভাঙ্গা ঘরের কথা উত্থাপন করতে গিয়েই মনে পড়লো আমার বউ বাসমতি হালদারের কথা। বললাম - ‘আমি এখন ঘরে যাবো।’

রোবট কর্মচারী, মাথায় লাল আলো, বললো- ‘সে তো যাবেনইআপনি এই দেশের একজন সম্মানিত ও আমন্ত্রিত নাগরিক। আচ্ছা , আজকে আমাদের এই ব্যবস্থাপনা আপনার কেমন লাগলো? যদি ভালো লাগে তাহলে ‘২’ টিপুন। যদি মোটামুটি লাগে তাহলে ‘১’ টিপুন , যদি খারাপ লাগে তাহলে ‘০’ টিপুন। রোবট কর্মচারীটির বুকে ঝোলানো কম্পিউটারের বোতাম। আমি কি টিপবো, না টিপবো এসব ভাবতে ভাবতে কি যেন একটা টিপে দিলাম।

সঙ্গে সঙ্গে চলে এলো, রাজকীয় বিশেষ বাহন , অতি আধুনিক।  অসুখ হলে যেমন ক্যাপসুল খেতে হয়, তেমনি ক্যাপসুলের মতো লম্বা একটা ঝকমকে গাড়ি।

রোবট কর্মচারীটি হেসে বললো-‘আপনি সরকারের সম্মানিত অতিথি। আপনি কম্পিউটরের বোতাম টিপে আমাদের সরকারী ব্যবস্থাকে এক্সেলেন্ট রেটিং দিয়েছেন। আপনি নিজেই নিজের মতো করে স্বপ্নের বাজেট বানাতে শিখে গেছেন। আরও একটা কথা, আপনি  স্বপ্নের সরকারী বাজেটকে সম্মান করেন। সরকার তাই আপনার উপর খুব খুশী। ... এজন্যে আপনাকে আরো কিছু অভ্যর্থনা দেয়া হবে। আপনাকে সসম্মানে নিয়ে যাওয়া হবে আমাদের কোষাগারে। সেখানে আনেক কিছু দেখবেন, বাইরের লোকেদেরও বলবেন – ‘প্রগতিই আমাদের মূলমন্ত্র। মনমোহিনী স্বপ্নের দিন আমাদের সামনে

রোবট কর্মচারীটি হাত নাড়লো- ‘বাই,বাই’ !

অতি আধুনিক  ক্যাপসুল যানটির দরোজা খুলে গেলো। আমাকে তাতে ঢুকিয়ে দেয়া হলো। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ক্যাপসুল-যানটি গান গাইতে গাইতে চললো !


সরকারী কোষাগার

সেখানে কাগজে নোট ছাপা হচ্ছে। কোথাও ধাতব মুদ্রায় অশোকস্তম্ভের ছাপ। প্রচন্ড নজরদারী। চারদিকে ক্যামেরার চোখ জ্বলছে- চোখগুলো দেখতে পায় , ওরা টুকে রাখে মানুষের গতিবিধি।

গতকাল রাতে একটা স্বপ্নের বাজেট বানাতে পেরেছি, তাছাড়া স্বপ্নের সরকারী বাজেটকে সম্মানও করি- আজকে তাই আমি সম্মানিত সরকারী অতিথি। আমাকে নিয়ে যাওয়া হলো, যেখানে মেশিনের ভেতরে কাগুজে নোটগুলোয় রঙ লাগছে, গান্ধীজির মাথা জুড়ছে, নম্বর লাগছে। একজায়গায় দেখলাম , লাইন দিয়ে বেরিয়ে আসছে ধাতব মুদ্রা। তার টুং টাং শব্দ। আমার মা যখন লেবু-নুনের সরবৎ পেতলের গ্লাসে-পেতলের চামচে নাড়তেন, তখন এমনই টুং টাং শব্দ হতো – মা বলতো, ‘পেতলের গ্লাসে লেবুর শরবত্‌ বেশী ক্ষণ রাখলে কল্কে ধরবে, তাড়াতাড়ি খেয়ে ফ্যালদেখবি , তোর রোগা শরীরটা ঠিক হয়ে যাবে।’  সে সব কোন শৈশবকালে আমার গেঁয়ো জীবনের কথা।

এই মাত্র মিন্ট কিংবা কোষাগারে ধাতব মুদ্রার টুং টাং শব্দ শুনে নিজেকে খুব স্বাস্থ্যবান বোধ হলো। শরীরটাকে খুব সুস্থ আর পাখীর মতো ফুরফুরে মনে হোলো।

একজন সরকারী কর্মচারী এগিয়ে এলেন। উনি টাকা তৈরী করেন। বছরে একবার আন্দামান নিকোবর কিংবা লাক্ষাদ্বীপ সরকারী পয়সায় ঘুরে আসেন। ওনার সন্তানেরা প্রাইভেটের দামী স্কুলে দাখিল হনওনার স্ত্রী পূজোর আগে প্রায় প্রতি বছরই দু-তিন ভরির গয়না কেনেন। এসব আমি বুঝি। তবুও লোকটির দিকে দুহাত তুলে আমি নমস্কার জানালাম।

এই সরকারী কর্মচারীটিও হেসে আমাকে স্বাগত জানালো, - ‘আপনি আমাদের সম্মানিত অতিথি। কারণ আপনি  সরকারী বাজেটকে সম্মান করেন। তাছাড়া আপনি নিজেই নিজের মতো করে একটা স্বপ্নের বাজেট বানিয়েছেন- এটা তো বিরাট ব্যাপার। আসলে দেশের প্রত্যেকটা মানুষকে এই বাজেট বানাতে শিখতে হবে, দেশের গনতান্তিক বাজেটকে সমীহ করতে হবে। আমাদের ফিনান্স মিনিস্টার এই আচ্ছা-দিনের বাজেট বানানোর জন্যে কত পরিশ্রম করেন, কত রাত জাগেন, কত আলোচনা চলে, আমলাদের সংগে কত তক্কাতক্কি হয়- পাবলিকেরা এসব কিছু বোঝে না।’

আসলে এসব লেকচার আমি শুনতে চাইছিলাম না। আমার ইচ্ছে ছিল, কি করে একটা কাগজের টুকরো চকচকে নোটের মতো ওজনদার হয়ে ওঠে, কি করে একটা টাকা ছাপা হয় – সেসব কিছু শিখে নেবার জন্যেআমি এটাও কাগজে পড়েছিলাম, কারা যেন বর্ধমানের বাগানবাড়িতে ঘরোয়া মেশিনে এমনি নোট ছাপে!

লোকটিকে আনুরোধ করলাম, ‘আমাকে যদি টাকার ছাপাখানাটা পুরো ঘুরে দেখার সুযোগ দেন। - এই মানে , আপনাদের কোষাগারে, কিভাবে একটুকরো কাগজ থেকে একটা নোট তৈরী হচ্ছে!’

সরকারী লোকটি হাসলো,-‘না না। এসবের নিষেধ আছে। কোষাগারে সিকিউরিটি একটা বড় ব্যাপার। আপনি আমাদের সম্মানিত অতিথি, আগামীর ভূবন-মোহিনী দিনের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার দরকার। আপনাকে এসব দেখানোর জন্যে এদ্দুর পর্যন্তই ঢুকতে দেয়ার অনুমতি হয়েছে। এর আগে যাবার নিষেধ আছে।’

আমি হতাশ হলাম। সম্মানিত অতিথি হয়ে কি হবে? আমার টাকার দরকারসামনের  সুরক্ষিত কাঁচের ভল্টে নানা মুদ্রা, সুসজ্জিত, বর্ণময়! আমার বাড়ির ভাঙা আলমারির কাঁচ ঝাপসা। বাসমতি , আমার বৌ, সেখানে শাড়ি কাপড়ের সঙ্গে মাসিকের ন্যাকড়াও লুকিয়ে রাখে। শেষ মেষ আমি আব্দার করলাম,- ‘ আচ্ছা, রাজকীয় কোষাগার দর্শনের স্মারক, মানে স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে, আমাকে কিছু নতুন মুদ্রা উপহার দেয়া যায় না কি  ? আসলে জানেন তো , গতকাল ঘুমের মধ্যে আমি একটা বাজেট বানিয়েছিলাম- সেটা তো ঠিক কথা- আসলে জানেন  তো, সেটা একটা ঘাটতি বাজেট। আমার ঘরে চাল ডাল বাড়ন্ত,   এমাসের রেশন তোলা হয় নি। মিনিমাম ব্যাঙ্ক-ব্যালান্সের জন্যে আমার খাতায় ফাইন জমা হচ্ছে।’

সরকারী কর্মচারীটি হাসলো।– ‘সে জানি। কিন্তু এখান থেকে কেউ সরাসরি টাকা পয়সা নিয়ে যেতে পারে না। চারদিকে সিকিউরিটি, পাহারাদার। ধরা পড়লে , যে কেউই হোক না কেন, জেল হয়ে যাবে!’

আমি হতাশ হলাম।

লোকটি আমাকে বললো,- ‘আপনার জন্যে অবশ্য একটা সুখবর আছে! টাকা বা মুদ্রা নয়। আমার কাছে নির্দেশ আছে, আপনাকে একটা কার্ড উপহার দেয়ার। যে সে কার্ড নয়, এর নাম ‘অশোক দুঃখ নিবারণ কার্ড’ । এতে একটা চিপস্‌ লাগানো আছে। এটা দিয়ে আপনি পঁচিশ, মানে অধিকতম পঁচিশ হাজার টাকা তুলতে পারবেন। আপনার আর কোন অভাব থাকবে না। এই নিন।’

সরকারী কর্মচারীটি  লেফাফার মধ্য থেকে একটা কার্ড বের করে আমাকে দেখালো। তার পরে লেফাফার মধ্যে সেটাকে ভরে আমার দিকে হাত বাড়িয়ে দিল। আমার উপহার! আমার রোজগারের উপায়। আমি খুব খুশী!

আমার পেট এখন ভরা। অর্থপ্রাপ্তিরও রাস্তা খুলে গেছে। খুল যা সিম সিম! মাসের রেশন তোলার অসুবিধা হবে না। ছেলেমেয়েদের স্কুল ফিসের মুস্কিল হবে না। বাসমতিকে সারপ্রাইজ দেবো। ঘরে ফেরার সময় রাজভোগ, সন্দেশ আর একটা সুন্দর শাড়ি কিনে নেবো!’

মন খুশীতে ভরে গেল। এটিএম কার্ডটা পকেটে ঢোকালাম। সরকারি সাহেবটিকে বললাম,- এবার আমার ফেরার ব্যবস্থা কি?

উনি আমাকে নিয়ে বেরিয়ে এলেন। একটু এগিয়ে একটা ফাঁকা জায়গায় দাঁড় করালেন। পকেট থেকে বের করে একটা টিভির রিমোট টিপলেন- ‘আপনার জন্যে গাড়ী আসছে, আপনাকে পৌঁছে দেবে মাঠে, সেখানে অপেক্ষা করছে হেলিকপ্টার। আপনি কয়েক ঘন্টার মধ্যেই পৌঁছে যাবেন ঘরে।’

-  ‘না- না- আমার হেলিকপ্টার চাই না। আমি হেঁটে টেম্পুতে বাসে ট্রেনে চেপেই আমার ঘরে পৌছে যাবো। শুধু এখন দিল্লী রেল স্টেশনের কাছাকাছি একটা এটিএম বুথের কাছেই আমাকে ছেড়ে দিলেই চলবে।’

হো হো করে হেসে উঠলো সরকারি আমলাটি! –‘ আরে না না, সে কি হয়? আপনি আমাদের একজন গুরুত্বপূর্ণ নাগরিক ও সম্মানিত অতিথি। দেশে আচ্ছে-দিন আসছে।আপনি ভালোভাবেই যাবেন। হেলিকপ্টারে যাবেন। হেলিকপ্টার কোম্পানীর সংগে আমাদের ইয়ারলি কনট্রাক্ট সেট করা আছে ।’


অবতরণ

হেলিকপ্টারটার দরোজা খুলে গেলো। আমি ভেতরে ঢুকে গেলাম। অটোমেটিক দরোজা বন্ধ হয়ে গেল। আকাশে উড়তে থাকলাম। একজন চালক, সংগে পিস্তল উর্দি বুট পরিহিত একজন সুসজ্জিত সহায়ক সঙ্গী! আমি আকাশচারী, জীবনে এই প্রথম, পাখী হওয়ার কি আনন্দ, কি বিস্ময়! নীচে ধূসর কিংম্বা সবুজের ল্যান্ডস্কেপ। পায়ের নীচে ঘর বাড়ি , রাস্তা নদী বন জঙ্গল পাহাড় টিলা ।

চালক পাইলট এই প্রথম জিজ্ঞাসা করলো,- ‘কোথায় নামবেন? কোথায় আপনার বাড়ী?’

-‘ গোকুলপুর।নদীয়া জেলায়।’

-‘ওখানে কি হেলিপ্যাড আছে?’

-‘সে সব তো জানি না, তবে বড় মাঠ আছে।’

-‘ ঠিক হ্যায়। হো যায়েগা।’

হেলিকপ্টারে উর্দি-পরিহিত একজন সুসজ্জিত গার্ড তার ব্যাগ থেকে বের করে একটা চকোলেটের বার আমাকে গিফট দিলো। প্রায় তিন ঘন্টার সফরে আমি প্রায় ঘুমিয়েই পড়েছিলাম। হঠাৎ পাশে বসা অ্যাটেনডেন্ট-গার্ডটির ধাক্কায় জেগে উঠলাম। বুক পকেটে হাত ছোঁয়ালাম। ‘অশোক দুঃখ নিবারণ কার্ড’টি পকেটে যথাস্থানেই আছে।

পাইলট বললো , ‘প্রায় এসে গেছি।কিন্তু আপনি কয়েকটা মাঠের কথা বলেছেন বটে , কিন্তু এখানে যে মাঠগুলো দেখছি, সেখানে আপনি নামতে পারবেন না। আপনি আমাদের সম্মানিত আতিথি। আপনাকে নিরাপদে নামতে হবে।’

পাইলট অ্যাটেনডেন্টকে বললো,- ‘প্যারাসুট পরিয়ে দাও। একটু লাফ দিলেই পৌঁছে যাবেন গোকুলপুরের মাটিতে। শুনে আমার বুকটা ডিপ ডিপ করতে লাগলো।

অ্যাটেনডেন্ট-গার্ডটি জ্যাকেটের মতো করে কি একটা আমায় পরিয়ে দিলো। বুঝিয়ে দিলো,- ‘এর নাম প্যারাসুট। আপনি খোলা জায়গা দেখে লাফ দেবেন। একটা ছাতা। একটা ছাতা খুলে যাবে। দেখবেন, আপ জমিন মে উতর গিয়া!’

এরোনটিক্যাল ম্যাপে গোকুলপুর কথাটা আসতেই সিগন্যাল বিপ বিপ করে জ্বলে উঠলো। নীচে ফাঁকা মাঠ। অ্যাটেনডেন্ট হুকুম দিল, ‘এখন লাফ দিন

আমি ভয়ে ভয়ে হেলিকপ্টারের দরজার দিকে এগোলামনীচে বাড়ি ঘর সাইকেল রিক্সা মানুষজন সব স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।

-‘ লাফ দিন লাফ দিন ভয় নেই, এই তো খালি মাঠ। আমি হাত ধরছি। লাফিয়ে পড়ুন

কিন্তু ভাবতে ভাবতে লাফ দিতে দিতে আমার একটু দেরী হয়ে গেলো। শেষ পর্যন্ত লাফ দিলাম!

প্যারাসুটে আমি নামছি! মাথার উপর প্যারাসুটের ছাতা। আমাকে নীচে রেখে মাথার উপর দিয়ে হেলিকপ্টার উড়ে যাচ্ছে। ফিরবে রাজধানী, যেখানে অঢেল খাওয়া, অঢেল পয়সা, বড় বড় ব্যাঙ্ক, ক্যাপসুল গাড়ী, ভূবন মন মোহিনী দিন-এর ফোয়ারা !

দৈনন্দিন বাতাস সিধা না গিয়ে আমার প্যারাসুটটাকে পাশের দিকে উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে। আমি হালকা পাখির মতো নীচের দিকে নেমে আসছি। আরেকটু নীচেই ঘরের ছাত, গাছপালা, মাটি।

ঝপাং করে আমি একটা নিমগাছে আটকে গেলাম। নিমতলার নিমগাছটা! আমি নিমগাছে ঝুলছি! প্যারাসুটের দড়ি আটকে আছে নিমের ডালপালায়। আমি সমরেশ হালদার, জীবন্ত ঝুলে আছি গাছে।

গ্রামের লোকজন দেখলো, নিমগাছের উপর বেলুনের মতো মস্তো একটা প্যারাসুটের ছাতা লটকে আছে। আমি উপর থেকে চ্যাচালাম,- ‘আমাকে নামাও, হেল্প মি , আমি গাছে আটকে আছি। নামাও । ... আমাকে নামাও। আমি গোকুলপুর কলোনীর সমরেশ হালদার!......’

-‘ আরে ওই দ্যাখো, ওই যে, হালদারদা গাছে ঝুলছে!’

কেউ কেউ গাছে উঠে এলো। কেউ নিয়ে এলো কাটারি-ছুরি খবর পেয়ে বাসমতি আর বাচ্চারাও ছুটে এলো।

অনেকের চেষ্টায়, সবাই মিলে প্যারাসুটের দড়ি কেটে, নিম গাছ থেকে আমায় নামিয়ে আনলো।

সবাই আমাকে জিজ্ঞাসা করলো,- ‘প্যারাসুটে কি ভাবে নামতে গেলেন? কোথা থেকে ফিরছিলেন? কি একটা হেলিকপ্টার আওয়াজ করতে করতে কোথায় উড়ে গেলো?’

আমি পকেটে হাত দিয়ে দেখলাম সরকারের দেয়া দুঃখ নিবারণ কার্ডটা পকেটেই আছে।

পেছনে ফেলে আসা কতগুলো প্রহর। একটা রাজকীয় সফর। সব মিলিয়ে আমি একটা ঘোরের মধ্যে আছি। আমার জীবন ফিরে গেছে। ভবিষ্যত উজ্জ্বল। এসব কাহিনী আমি সবাইকে খোলসা করে বলতে গেলাম না। এসব ব্যাপারে একটু রাখো ঢাকো রাখা ভালো!

বললাম- ‘না,না, রাজধানীতে গেছিলাম। আচ্ছা-দিন আসছে! তারই জন্যে একটা সরকারী সফর ছিলো। আমার এক বন্ধু রাজধানীতে আছে কি না। হেলিকপ্টার আর প্যারাসুটে ওরাই আমাকে এখানে পৌঁছে দিয়ে গেল। আসলে দেশবন্ধু মাঠটার কাছে আমার লাফ দেয়ার কথা, লাফ দিতে কয়েক সেকেন্ড দেরী করায় এই হাল! নিম গাছে লটকে গেলাম!’ আমি লজ্জিত হলাম।

‘আহা, আহা, কোন চোট তো লাগেনি?’ –সুবলদা জিজ্ঞেস করলো।

- ‘না, না, আপনারা ভাববেন না। আমি খুব ভালো আছি।’


অশোক দুঃখ নিবারণ কার্ড

ঘরে খাটের উপর বসলাম। আমার চোখে মুখে কেউ কেটা ভাব! নাকে লেগে আছে অতি ভোজনের সুগন্ধ! আমার দুচোখে তখন টাকা থপাথপ টাকা ছাপানোর দৃশ্য। বউ বাসমতির চোখেও কি আমি পালটে গেছি?

বাসমতি আমার জন্যে চায়ের কাপে চিনি মেশাচ্ছে। চামচের টুং টাং শব্দে আমি শুনলাম , কোষাগারের অসংখ্য মুদ্রার শব্দ। আমরা ঘুমাতে গেলেই ওই টুং টাং শব্দগুলো রাতের বিছানা বালিশে যে কোন সময়েই ঝরে পড়তে পারে।

মেয়ে জিজ্ঞেস করলো – ‘বাবা, তোমাকে আজ অন্য রকম লাগছে?’

আমি বললাম,-‘না, না! আমি দেখে এসেছি, আচ্ছা-দিন আসছে। আমার পকেটে আছে আলাদীনের প্রদীপ - দুঃখ নিবারণ কার্ড; দেখিস আমাদের আর দুক্কো টুক্কো থাকবে না।’


উপসংহার

আমি আর বাসমতি। ব্যাক কেরিয়ার সাইকেলে । দুজনে পৌঁছে গেলাম। এটিএম কাউন্টারে।

গার্ড সরে দাড়ালো। দুজন মিলেই এটিএম-এর ঠান্ডা ঘরে ঢুকলাম।

কত টাকা তুলবো? পাঁচ, দশ, বিশ , মাসে পঁচিশ হাজার পর্যন্ত তোলা যাবে। আমার বুক কাঁপছে? পাস ওয়ার্ড টিপলাম। কিন্তু টাকা বের হলো না।

মেশিন বললো – ইনভ্যালিড কার্ড।

জিজ্ঞেস করলাম-‘ মেশিন কি খারাপ আছে দাদা?’

-‘না নামেশিন খারাপ হতে যাবে কেনো? এইমাত্র তো অন্য লোকেরা টাকা তুলে নিয়ে গেলো।’

-‘না, না, এটা স্পেশাল এটিএম কার্ড।   ‘অশোক দুঃখ নিবারণ কার্ড’সরকারের দেয়া... এ কার্ড কেমন করে ইনভ্যালিড হবে!’

গার্ড বললো,- ‘এ দেশে এমন কোন কার্ড হতে পারে কি? দেখান তো কার্ডটা

কার্ডটা দেখালাম। গার্ড বললো- ‘এটা স্পেশাল কার্ড তো বটেই। সরকারী মোহর লাগানো। হে রে রে, এতে চিপ্‌সটা যে লাগানো থাকে- সেটা গেলো কোথায়? নির্ঘাত চিপ্‌সটা খসে পড়ে গেছে। হয়তো ঠিকঠাক পেষ্ট করা হয় নি! বিনা মাইক্রোচিপে কি আর কার্ড দিয়ে টাকা ওঠে?’

আমি এটিএম ঘরে রাখা গার্ডের ছোট্ট টুলটায় বসে পড়লাম। গার্ড বললো- ‘সরকারী দুঃখ নিবারণ কার্ড-এ ম্যানুফ্যাকচারিং ডিফেক্ট ! হে – হে- হে ! ’

আমার বানানো বাজেটের স্বপ্ন-কাগজটা কুচো কুচো হয়ে গেল।বাজেটের  কুচোগুলো শিকারী বকের মতো পাখনা মেলে মাছ-শিকারের ধান্ধায় সম্প্রতি বিক্রি হয়ে যাওয়া তারাপদর-বিলটার দিকে উড়াল দিলো।


© biswas.samarendra@hotmail.com

গাঙচিল পত্রিকা /  অক্টোবর - 2018


 


Comments

Popular posts from this blog

অণুগল্প / এমারজেন্সি - সমরেন্দ্র বিশ্বাস

হিসেবের খাতা