Posts

মেয়েটার নাম

  মেয়েটার নাম সমরেন্দ্র বিশ্বাস   শবঘর, মর্চুরির সামনে। সকাল দশটা। রোদ্দুরটা বড়ো ম্লান । একে একে লোকজন জড়ো হচ্ছে। একটু পরে মেয়েটার মৃতদেহ শ্মশানে যাবে । আইসিইউতে ভর্তি ছিলো। বেশ কিছুদিন ধরে। কখনো নাড়ি পাওয়া যাচ্ছিল, কখনো সেটা খুব ধীরে, না-এর মতোই। গতকাল সন্ধ্যা ছটা নাগাদ ঘোষণা করা হলো সে মৃত! হাসপাতালে ওর মুখ আর শরীর কাপড়ে ঢাকা । একটা ধাতব ট্রে উপর বডিটা, ট্রলির ওপর শোয়ানো। কিছুটা গেলেই লাশঘর। সেই রাত্তিরটুকু রেখে দেয়া হলো লাশঘরে। পরদিনলোকজন জড়ো হয়েছে। স্বর্গরথ গাড়ি এসে গেছে। লাশঘর থেকে বের করে নিয়ে আসা হলো মেয়েটাকে। দুজন শবযাত্রী পরখ করে নিচ্ছিলো, এটা তাদেরই লাশ কিনা। মুখের কাপড় তুলতেই মেয়েটা যেন চোখ মেলে ক্ষীণ চাইলো, আবার চোখ বন্ধ হয়ে গেলো। দুজনেই বিস্মিত! জমা হওয়া লোকজনদের মধ্যে ফিসফাস, বিস্ময় । কাপড়ে ঢাকা একটা শরীর। একজন নাকের কাছে হাত নিয়ে দেখলো, মনে হচ্ছে শ্বাস নিচ্ছে। তার মানে সত্যিই কি বেঁচে আছে? লোকজনের গুঞ্জন। বিপন্ন বিস্ময়! একটা জ্যান্ত মানুষ লাশঘরে তেরো ঘন্টা কাটিয়েছে, এটাই বা কি করে সম্ভব! শববাহী গাড়িটাকে শ্মশানের বদলে ঘুরিয়ে দেয়া হলো হাসপাতাল...

গোরস্থান

  গোরস্থান সমরেন্দ্র বিশ্বাস # # বার বার ঘুম ভেঙ্গে যায় যে লোকেরা কবরের মাটিতে ঘুমায় তারা সব আমাদের মতো কেউ কেউ। নিস্তব্ধ নিশুতি রাতে মৃত মানুষেরা জেগে ওঠে , হ্যারিকেন লন্ঠন নিয়ে মানুষের মিছিলে আরো কতো শব সারি বেঁধে আসে ; কত দিন সকলের ঘুম নেই। এইসব মৃত মানুষেরা প্রতিরোধ খুঁজে খুঁজে ক্লান্ত হয়েছিল , এইসব মৃত মানুষেরা পরিমিত অক্সিজেন খুঁজে খুঁজে ব্যর্থ হয়েছিল ; তাই তারা এইখানে এসেছিল সারি বেঁধে শুতে । এত কিছু দেখে দেখে অ্যাসেম্বলির নির্লজ্জ ঘন্টা পোস্টাফিসের উদাসী ঘড়ি আজও গাড়লের মতো ঝোলে। মানুষের শিরায় শিরায় তিখা স্রোত। ## [ কাব্যগ্রন্থ – অনন্ত জলশব্দে আমি   ]

এই সময়

  এই সময় সমরেন্দ্র বিশ্বাস     সৈনিক লোকটা শহীদ ছিল, পদকপ্রাপ্ত লোকটা মূর্খ ছিল। সে অকারণেই ছিঁড়ছিল বেড়া , ভাঙ্গছিল আগুন আর তুষার ঝড় , তাকে জানতেই দেয়া হয় নি , এ যাবৎ সমস্ত ভাতৃঘাতী যুদ্ধই কারণহীন !     অনুদান অদৃশ্য মৃত্যুর অকস্মাৎ হাত নেমে এলে বিধবা বউএর বিষন্ন কুটিরে বিউগিল কুঁচকাওয়াজে হেঁটে আসে দৃশ্যময় অনুদান খাম।     আবাদ যে লোকটা চেঁচিয়ে প্রতিবাদ করেছিল তার জিহ্বা কেটে কবর দেয়া হলো মাটিতে। কিছুদিন বাদেই আর্দ্র ঊর্বর সেই জমিতেই গজিয়ে উঠলো ডালপালা মেলা ভাতৃঘাতী আর্তনাদ !   প্রকাশিত – কবিতা সীমান্ত [ মে - অক্টোবর - 2019 সংখ্যা ]

দেবদারু একটি নদীর নাম

Image
  দেবদারু একটি নদীর নাম সমরেন্দ্র বিশ্বাস নদীর গতিপথকে কারা কিনে নেয়? নদীর জলে কেন ভেসে আসে মানুষের লাশ? কেন বন্দুকের গুলি ? কেনই বা মৃত মানুষের দুর্গন্ধময় শরীর ? দেবদারু নদীটাকে বেঁচে দেয়া হয়েছে । হাওয়ায় হাওয়ায় এ খবরটা ছড়িয়ে পড়লো দিকে দিকে , আশপাশের শহরগুলোতে , সংবাদপত্রেও । গাছপালা , পশুপাখি , যাদু - টোনা করে যারা ভূতপ্রেত নামায় , তারা সবাই এ খবরে শিউরে উঠলো । পবন খুড়ো মাটির ঘরের দাওয়ায় বসে বিড়ি টানছিল । সে বললো , এরপর তো হাওয়াকেও বেচে দেয়া হবে । বলবে , একঘন্টা নিঃশ্বাস নিয়েছো , এবার টাকা দাও ! খবর কাগজে নদী বিক্রির খবরটা ছোট্ট করে ছাপা হলো । দেবদারু নদীকে লিজ দেয়া হয়েছে মেসার্স বার্ড অ্যান্ড ওয়াটার রিসোর্স কোম্পানীকে । ভাঙ্গনধরা গ্রামটার কাছে বাঁধ বা এনিকট তৈরী হবে । সেখান থেকে উপরের কুড়ি কিলোমিটার পর্যন্ত নদীটার নিয়ন্ত্রণ এই কোম্পানীর হাতেই । ভবিষ্যতে সবাইকে এদের থেকেই জল কিনতে হবে । এ কি অলুক্ষুণে কথা ! কি যে দিনকাল আসছে ! দেবদারু নদীটা বিক্রি হচ্ছে । এরপর দেখতে দেখতে পয়সায়ালা মালিকেরা কিনে নেবে দুপাশে গাছপালা, বন জঙ্গল , ঝোপঝাড় , পাখি ওড়া আকাশটাও ! এই ন...

সম্রাট ও শবদেহ

Image
  সম্রাট ও শবদেহ [ একটি কাল্পনিক কথোপকথণ ] সমরেন্দ্র বিশ্বাস # তাজমহলের শ্বেতপাথরকে ফুঁড়ে এইমাত্র বেরিয়ে এলো একটি বলিষ্ঠ মূর্তি ! অন্ধকারে ঠাওর করা যাচ্ছে না , কে এই ব্যক্তিটি ? ইনিই কি মহামান্য শাজাহান ? হাল্কা হাওয়া । কুলকুল শব্দে বয়ে যাচ্ছে যমুনা নদী । সু - পুরুষোচিত স্কন্ধ , বলিষ্ঠ মূর্তিটি তাজমহলের চার পাশ ধরে হাঁটতে লাগলেন । একবার সৌধটির চতুর্দিক প্রদক্ষিণ করে তার মনটা খুশীতে ভরে উঠলো । এবার তিনি বহমান নদীটার তীরে এসে দাঁড়ালেন । মন ভালো করা হাল্কা জোছনা । তার মাথায় প্রচুর চিন্তা । প্রতিপক্ষরা সিংহাসন দখলের জন্যে ওৎ পেতে আছে । দেশের চারদিকে গন্ডোগোল । মানুষজন তার উপর কি ক্ষেপে আছে ? মহামারীতে অসংখ্য লোক মারা যাচ্ছে ! কিভাবে তিনি তার রাজধর্ম রক্ষা করবেন ? দেশের সিংহাসন অতীব মূল্যবান ! যমুনার তীরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে এমনি অনেক কিছু ভাবছিলেন । এমন সময়ে বলিষ্ঠ মূর্তিটির নজরে এলো একটা জিনিষ নদীতে ভাসতে ভাসতে তার দিকেই এগিয়ে আসছে ! একটু সামনে আসতেই বোঝা গেল ভাসমান বস্তুটি একটি মৃত মানুষের লাশ ! একটা হাওয়ার দাপট ! ভাসমান লাশটি নদীতীরে সংলগ্ন একটা ঝোপের শেকড়ে...