Posts

ছিন্নমূল মহুয়া ও বিষাদ বালক

  অনুগল্প ছিন্নমূল মহুয়া ও বিষাদ বালক সমরেন্দ্র বিশ্বাস ছলকুর মা বাবুজীর বাড়িতে কলতলায় একডাই বাসন মাজছিল । একটু টান দিতেই ছলকুর অনিচ্ছুক হাতে মহুয়ার টবটা চাকনাচুর হয়ে গেল । বেড়িয়ে পড়লো একগুচ্ছ কচিকচি শেকড় । মহুয়ার চারাটা এখনই ফিরে যেতে চাইছে ভিজে অন্ধকারে , ফেলে আসা জঙ্গলের গভীরে । ছলকুও এমনটাই হয় । ও ফিরে যেতে চায় । অথচ রোজ ভোরে বিসাদবাই ওকে টানতে টানতে কাজের বাড়ী নিয়ে আসে । বছর দশেকের ছলকু , ওর ভাল্লাগে না এই শহর । স্বপ্নে ভাসে বস্তার - এর আদিবাসী জঙ্গল , শাল মহুয়া । মনে পড়ে ন্যাংটো কালের সঙ্গীসাথীদের ! বিসাদবাই ঠিকে ঝি - এর কাজ করে । ছলকুকেও কাজে লাগায় । ছলকু বাগান সাফ করে , টবের গাছে জল দেয় । যখন জল ঢালে , ছড় ছড় জলের শব্দে ওর সামনে জেগে ওঠে গ্রামের ফেলে আসা সেই পাথুরে নদীটা ! বিসাদবাই - এর ডোকরাকে ( স্বামী ) উগ্রবাদী সন্দেহে কারা ধরে নিয়ে গেছে ! ওদের গ্রামের ছাউনিগুলোকে আগুনে জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছে ! পাঁচ বছরের বাচ্চাটাকে কোলে নিয়ে গ্রামের আরো মানুষজনের সাথে বিসাদবাই এসে উঠেছে এই শিল্প - শহর ভিলাইএর বস্তীতে । বাবুজীর আউরত , এই বাড়ীর মালকিন , মাতাজী ইতিম...

ভিলাইতে বাংলা কবিতা চর্চা – সংক্ষিপ্ত প্রতিবেদন

Image
  ভিলাইতে বাংলা কবিতা চর্চা – সংক্ষিপ্ত প্রতিবেদন সমরেন্দ্র বিশ্বাস # ভিন প্রদেশে বসে যারা সাহিত্য বা কবিতা চর্চা করেন, তাদের মধ্যে কতগুলো চালিকা শক্তি কাজ করে। যেমন কেউ কেউ প্রবাসের বিচ্ছিন্নতায় নিজস্ব প্রদেশের সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখতে এই লেখালেখির জগতে আসেন। কেউ বা মনন ও নিজের অবসর চর্চার একটা উপায় হিসাবে এই লেখালেখিকে বেছে নেন। কেউ বা কোন আদর্শ বা রাজনৈতিক তাগিদে কলম তুলে নেন। পুরো সময়ের পেশা হিসেবে সাহিত্যকে বেছে নেয়া, প্রবাসে এমনটা কমই দেখা যায় । বাংলার বাইরে কবিতাচর্চা নানা জায়গাতেই হয়ে থাকে। ভারতবর্ষ ও ছত্তিশগড়ের বিখ্যাত ইস্পাত শহর ভিলাইও এর ব্যতিক্রম নয়। বরং সাহিত্য ও কবিতা চর্চায় ভিলাই অঞ্চল যথেষ্ট সক্রিয় ও তৎপর। একদা মধ্যপ্রদেশ, অধুনা ছত্তিশগড়ের অন্তর্গত ভিলাই একটা শিল্প শহর। এখানকার মূল কারখানাটি ভিলাই স্টীল প্লান্ট, যা কিনা অনেকগুলো ফ্যাক্টরি সমন্বিত একটা ইন্টিগ্রেটেড(সংযুক্ত)প্লান্ট।   তাছাড়া এখানে আরও অন্যান্য কিছু কল কারখানা রয়েছে। রুখা শুখা গ্রামগুলিকে সরিয়ে দিয়ে তখন ভিলাই স্টীল প্লান্ট তৈরী হচ্ছে, সেসব ১৯৫৭ ও তার পরবর্তী সময়ের কথা। তখন থেকে...

আমার কোন প্রমান পত্র নেই।

Image
  আমার কোন প্রমান পত্র নেই । সমরেন্দ্র বিশ্বাস   # আমি নিজেকে জেনেছি সীমান্তবিহীন এক অস্তিত্ত্ব - কেননা কাঁটাতারের বেড়া কোন উদ্বেলিত প্রাণকে সীমান্তে আটকে রাখতে পারে না ! সেই কবে থেকেই নিজেকে আমি মনে মনে ভাবি চরাচর জুড়ে ব্যাপ্ত নাগরিক পঞ্জিবিহীন কোনো জীবন কাহিনী ! আকাশের ভাসমান পাখি - ওদের কি কোনো রেশন কার্ড ছিলো ? আমি হাওয়ায় হাওয়ায় উড়ে বেড়ানো ফুলের পরাগ ,                 যার ইচ্ছে নতুন নতুন ফলকে ওগানো ; আমি হাওয়া । ইচ্ছে অনিচ্ছের বাইরে রপ্তানী হওয়া অজস্র শস্যবীজ - যে কিনা হাজার হাজার বছর ধরে নানা দেশে বহুবিধ সন্তানের জন্ম দিয়েছে । # আমাকে ক্ষমা করো -   এই দেশে এ পর্যন্ত অনেকবার আমি পালটে ফেলেছি আমার জন্মনাম , কারণ নাম - পাল্টানোটাই আমার শখ । এ যাবৎ চার চার বার আমি পালটে নিয়েছি আমার জন্মতারিখ – কারণ আমার                                               ...

আমরা কেউ তত ভালো নেই

  আমরা কেউ তত ভালো নেই সমরেন্দ্র বিশ্বাস # বুকের মধ্যে অ্যম্বুলেন্স , বুকের মধ্যে দমকলের ভারী ভারী ঘন্টা! হাতে মোবাইল , পকেটে ট্যাবলেট , ভালো কি আছি ? তুমি কেমন আছো ? #              বারো ইঞ্চি বুকের মধ্যে বোঝা-পড়া , ওঠা নামা ঝুপঝাপ দুঃখের পাড় ভাঙছে ; জেগে জেগে আমাদের রাত্রিগুলো লোহা কিংবা ঝামার মতো কালো। তুমি কাছে থাকলে কালো রাত্রিটাকে দুমুঠো চালের মতো ভাগাভাগি করে নিতাম , এক সঙ্গে গান গাইতাম। ঘরের দেয়ালে বিপ্ বিপ্ জ্বলে উঠলো অ্যালার্ম সংকেত , কতোদিন মায়ের হাতে পাখার বাতাস খাই নি! # জীবন কোথায় , জীবনটা কেমন ? নিহত মানুষ জন্তুর মতো হাত-পা বাঁধা ঝোলে আতাতায়ী বাহকের বাঁশে! আলতামিরার গুহাচিত্রে প্রাগৈতিহাসিক অন্ধকার – কেমন অনায়াস শিকার শিকার খেলা , বিপন্ন মানুষের রক্তছাপ দেয়াল থেকে আজও মোছে নি! # একদিন জলস্রোতে গান ছিল , জনস্রোতে গতি ছিল আজ কাল নাকি কিছু নেই – সংস্কারবিহীন-সোঁতা পড়ে আছে অনাবাদী বালুচরে , আর আছে ভারী ভারী লোহা-মেলা ব্রীজ , যন্ত্রযান যাবে । # তুমি আমা...

ভূপাল : ডিসেম্বর ১৯৮৪

Image
  ভূপাল : ডিসেম্বর ১৯৮৪ # মধ্যরাতে অকস্মাৎ ঘুমন্ত স্বপ্নের মাঝে তড়িৎ ঝট্ ‌ কা - অতঃপর দাপাদাপি , থেমে যায় চলমান স্বপ্নের স্লোগান । # গ্যাস চেম্বার হরদম তৈরী থাকে বুর্জোয়ার কোটের প্যাকেটে , এত কিছু না বুঝেই গাঢ় ঘুমে শুয়ে থাকে কাঁচি হাতে যতসব কোটের মজুর । # অতঃপর সরকারী অনুদান হাজার টাকায় । নির্বংশ ভিটে বাড়ির কাপড়ের তারে কাকের কর্কশ ডাক দিগন্ত কাঁপায় । ভেসে ওঠে সভ্যতার গলাপচা লাশ । # ভারতের দখলী দেয়ালে আঠা খোলা ছিন্ন এক পোষ্টারের মতো আপাতত ঝুলে থাকে ভূপাল নগরী – অন্তর্গত জ্বর আর ঝড়ের ঘর্ষণে পোস্টারের বর্ণমালা থির থির কেঁপে যায় । # সমরেন্দ্র বিশ্বাস [ তবু স্পন্দমান পথ (1986) ]

অনাত্মীয় শহরকথা

  অনাত্মীয় শহরকথা # সমরেন্দ্র বিশ্বাস # ভালো না লাগা শহরের মধ্যে অবাঞ্ছিত জঙ্গলের রাস্তা শুরু হতেই আমি গতিমান শকট থেকে নেমে পড়ি। পায়ের নীচে উত্তপ্ত পাথর, নক্ষত্রের চোখ উধাও।  ফ্লাটবাড়িতে কাঁচের পিরিচে রাখা কসমেটিক; শ্বেতপাথর চেরাই করা লাস্যময়ী মহিলারা জলের বদলে হাতে তুলে দেয় বিতর্কিত বর্ণময় পানীয়। তাদের বাষ্পীভূত সম্ভাষণ উদ্দেশ্যহীন লটকে থাকে দেয়ালের ফার্নিচারে। একদিন তোমার চোখের থেকে ছুটে এসেছিল যে প্রজাপতি, ইলেকট্রিক তারে আটকে যায় তার পরাগরেণু গন্ধ, ছিঁড়ে যায় উড়ান ডানার দিগন্ত-রঙ্গীনবিস্তার। হারিয়ে যায় সাদাপর্দায় স্কুলমাঠের সম্মিলিত বায়স্কোপের রিলছেঁড়া সময় । এখন ডিজিটাল ছায়াছবিতে স্নেহহীন সময়, অসহিষ্ণু জীবন, বলিউডি হিংসা । শহরের এই অনাত্মীয়তায় আমি হাফিয়ে উঠি! বাস্তবের এই বসবাসের শহর, তার অবরুদ্ধতা আমাকে দাঁড়া করিয়ে রাখে এক অথর্ব শ্মশাণভূমির সামনে। ড্রেনের ফাটলে চুইয়ে পড়ে পার্থিব সময়। শহরের ক্লান্তির বিপরীতে বেজে ওঠে আম আঁটির ভেঁপু, আঁকা হয় উন্মুক্ত দিগন্তের ডানা মেলা রামধনু । নদীর ভাঙ্গনে ডুবে যাওয়া আমার গ্রামটাকে জালে বেঁধে দুরন্ত ডিঙ্গিতে তুলে আনছে যেসব পরাণকথা...

বহুমাত্রিকতার গল্পকার সুবল দত্ত

Image
  বহুমাত্রিকতার গল্পকার সুবল দত্ত সমরেন্দ্র বিশ্বাস # # # ভোর রাত্রের একটা দৃশ্য এরকম – একটা ঘরের জানালা দিয়ে বেরিয়ে আসছে রমণ ও শীৎকারের শব্দ। হরিদাস প্রভাতী নাম সংকীর্তন করতে করতে হেঁটে যাচ্ছে – তার শব্দ। দূর থেকে এগিয়ে আসছে মৃতদেহ কাঁধে শ্মশানযাত্রীর দল। হরিনাম ধ্বনি ও তাদের খোলকরতালের শব্দ। এতো কিছু শব্দ মিলে সেই ভোর রাত্রের যে অনুনাদ বা রেসোনেন্স তৈরী হলো, তাতেই এই দুনিয়ায় একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটে গেলো। পৃথিবীর সময় উল্টো দিকে ঘুরতে শুরু করলো। যে মৃত যুবতীটি একটু আগেই কবরে শুয়ে ছিলো, সে জীবিত হয়ে উঠে এলো। ১৯৮০ সাল ১৯৮১র দিকে না গিয়ে এই দুনিয়ার সময় এগোতে লাগলো পেছনে, ১৯০০ সাল বা প্রাচীন পৃথিবীর দিনগুলোর দিকে। আমরা দেখলাম, এখন যে যুবতীটি মৃত, সে বেঁচে উঠেছে, ঘড়ির কাঁটা আরো পেছনে ঘুরতেই সে ধর্মযাজক দ্বারা ধর্ষিতা হচ্ছে! পৃথিবীর সময় আরো আরো পেছোচ্ছে, সোনার দাম কমছে। সেসব দিনগুলোয় আগের মতো দূষণ বা পল্যুশন নেই, সুন্দর একটা প্রাকৃতিক পরিবেশ। গল্পকারের দারুণ কল্পনাশক্তি, অসাধারণ পরাবাস্তবতা! এমনটাই লেখে সুবল দত্ত - তার ‘সময়-শোধন’ গল্পে। ঘড়ির কাঁটাকে এরকম পিছিয়ে নিয়ে গেলে আজকের মানুষ ...